আমলকী:
আমলকী বা ‘আমলকি’ একপ্রকার ভেষজ ফল।
সংস্কৃত ভাষায় এর নাম ‘আমালিকা’।
ইংরেজি নাম ‘aamla’ বা ‘Indian gooseberry’।
আমলকি গাছের বৈজ্ঞানিক নাম Phyllanthus emblica বা Emblica officinalis।
জন্মস্থান: আমলকীর আদিভূমি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া হলেও ফলটি সবচেয়ে ভালো জন্মে পাহাড়ে। আমলকী গাছ বাংলাদেশ, ভারত, শ্রীলংকা, মায়ানমার, মালয়েশিয়া ও চীনে দেখা যায়।
বৈশিষ্ট: আমলকী গাছ ৮ থেকে ১৮ মিটার উচ্চতা বিশিষ্ট হতে পারে, পাতা ঝরা প্রকৃতির। হালকা সবুজ পাতা, যৌগিক পত্রের পত্রক ছোট, ১/২ ইঞ্চি লম্বা হয়। হালকা সবুজ স্ত্রী ও পুরুষফুল একই গাছে ধরে। ফল হালকা সবুজ বা হলুদ ও গোলাকৃতি ব্যাস ১/২ ইঞ্চির কম বেশি হয়। কাঠ অনুজ্জল লাল বা বাদামি লাল। বাংলাদেশের প্রায় সব অঞ্চলে ই দেখা যায়। গাছ ৪/৫ বছর বয়সে ফল দেয়। আগষ্ট – নভেম্বর পর্যন্ত ফল পাওয়া যায়। বীজ দিয়ে আমলকির বংশবিস্তার হয়। বর্ষাকালে চারা লাগানোর উপযুক্ত সময়।
কাঁচা আমলকি:
আমলকি নিয়ে প্রাথমিক গবেষণা সম্পন্ন হয়েছে। এতে দেখা গেছে যে, এটি ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করতে পারে। প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া গেছে যে, রিউমেটয়েড আর্থ্রাইটিস এবং অস্টিওপোরোসিস রোগে আমলকির রস কিছু কাজ করে। কয়েক ধরনের ক্যান্সারের বিরুদ্ধেও এর কার্যকারিতার প্রমাণ পাওয়া গেছে। প্যানক্রিয়াটাইটিস রোগেও আমলকি কার্যকর বলে ইঁদুরের উপর চালিত গবেষণায় প্রমান মিলেছে। প্যানক্রিয়াটাইটিস রোগের পরে ক্ষতিগ্রস্ত প্যানক্রিয়াস (অগ্ন্যাশয়) -এর ক্ষত সারাতে আমলকি কার্যকর। আমলকির ফল, পাতা ও ছাল থেকে তৈরি পরীক্ষামূলক ওষুধে কিছু রোগ নিরাময়ের প্রমাণ পাওয়া গেছে যেমন- ডায়াবেটিস, ক্যান্সার, প্রদাহ এবং কিডনি-রোগ। আমলকি মানুষের রক্তের কোলেস্টেরল-মাত্রা হ্রাস করতে পারে বলে প্রমাণ রয়েছে ডায়াবেটিক ইঁদুরের উপর চালানো এক গবেষণায় দেখা গেছে, আমলকির রস রক্তের চিনির মাত্রা কমাতে পারে এবং লিভারের কর্মক্ষমতা পুনরোদ্ধারে সাহায্য করতে পারে। আমলকিতে প্রচুর ভিটামিন-সি বা এস্করবিক এসিড থাকে (৪৪৫ মিগ্রা/১০০ গ্রাম)। তা সত্ত্বেও আরো অন্যান্য উপাদান নিয়ে মতভেদ আছে এবং আমলকির ‘এন্টি-অক্সিডেন্ট’রূপে কার্যকারিতার পেছনে মূল ভূমিকা ভিটামিন-সি এর নয়, বরং ‘এলাজিটানিন’ নামক পদার্থসমূহের বলে মনে করা হয়।যেমন এমব্লিকানিন-এ (৩৭%), এমব্লিকানিন-বি (৩৩%), পানিগ্লুকোনিন (১২%) এবং পেডাংকুলাগিন (১৪%).এতে আরো আছে পানিক্যাফোলিন, ফিলানেমব্লিনিন-এ, বি, সি, ডি, ই এবং এফ।এই ফলে অন্যান্য ‘পলিফেনল’ও থাকে। যেমন- ফ্ল্যাভোনয়েড, কেমফেরল, এলাজিক এসিড ও গ্যালিক এসিড।
ব্যবহার:
আমলকির ভেষজ গুণ রয়েছে অনেক। ফল ও পাতা দুটিই ওষুধরূপে ব্যবহার করা হয়। আমলকিতে প্রচুর ভিটামিন ‘সি’ থাকে। পুষ্টি বিজ্ঞানীদের মতে, আমলকিতে পেয়ারা ও কাগজি লেবুর চেয়ে ৩ গুণ ও ১০ গুণ বেশি ভিটামিন ‘সি’ রয়েছে। আমলকিতে কমলার চেয়ে ১৫ থেকে ২০ গুণ বেশি, আপেলের চেয়ে ১২০ গুণ বেশি, আমের চেয়ে ২৪ গুণ এবং কলার চেয়ে ৬০ গুণ বেশি ভিটামিন ‘সি’ রয়েছে।
একজন বয়স্ক লোকের প্রতিদিন ৩০ মিলিগ্রাম ভিটামিন ‘সি’ দরকার। দিনে দুটো আমলকি খেলে এ পরিমাণ ভিটামিন ‘সি’ পাওয়া যায়। আমলকি খেলে মুখে রুচি বাড়ে।স্কার্ভি বা দন্তরোগ সারাতে টাটকা আমলকি ফলের জুড়ি নেই। এছাড়া পেটের পীড়া, সর্দি, কাশি ও রক্তহীনতার জন্যও খুবই উপকারী।লিভার ও জন্ডিস রোগে উপকারী বলে আমলকি ফলটি বিবেচিত। আমলকি, হরিতকী ও বহেড়াকে একত্রে ত্রিফলা বলা হয়। এ তিনটি শুকনো ফল একত্রে রাতে ভিজিয়ে রেখে সকালবেলা ছেঁকে খালি পেটে শরবত হিসেবে খেলে পেটের অসুখ ভালো হয়।বিভিন্ন ধরনের তেল তৈরিতে আমলকি ব্যবহার হয়। কাঁচা বা শুকনো আমলকি বেটে একটু মাখন মিশিয়ে মাথায় লাগালে খুব তাড়াতাড়ি ঘুম আসে।কাঁচা আমলকি বেটে রস প্রতিদিন চুলে লাগিয়ে দুতিন ঘন্টা রেখে দিতে হবে। এভাবে একমাস মাখলে চুলের গোড়া শক্ত, চুল উঠা এবং তাড়াতড়ি চুল পাকা বন্ধ হবে।
আমলকী খাওয়ার উপকারিতা
- আমলকীতে সামান্য লবণ, লেবুর রস মাখিয়ে রোদে রাখুন। শুকিয়ে যাওয়ার পর খেতে পারেন।
- আমলকী মাঝারি আকারে টুকরো করে নিয়ে ফুটনত্ম পানির মধ্যে দিন। আমলকী নরম হয়ে তরে নামিয়ে ঝরিয়ে লবণ, আদা কুঁচি, লেবুর রস মাখিয়ে রোদে রেখে দিতে পারেন। সারা বছরই ভাল থাকবে।
ভিটামিন সি’সমৃদ্ধ আমলকীতে প্রচুর পরিমাণে এ্যান্টিঅক্সিডেন্ট উপাদান রয়েছে। বিভিন্ন অসুখ সারানো ছাড়াও রোগ প্রতিরোধক ৰমতা গড়ে তুলতেও আমলকী দারুণ সাহায্য করে। আমলকীর গুণাগুণের জন্য আয়ুর্বেদিক ওষুধেও এখন আমলকীর নির্যাস ব্যবহার করা হচ্ছে।
ঔষধি গুণ*
- আমলকী কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের উপর কাজ করে।
- বমি বন্থে কাজ করে।
- দীর্ঘমেয়াদি কাশি সর্দি হতে উপকার পাওয়ার জন্য আমলকীর নির্যাস উপকারী।
- এটি হৃদযন্ত্র ও মস্তিষ্কের শক্তিবর্ধক।
- ভিটামিন সি’সমৃদ্ধ আমলকীতে যথেষ্ট পরিমাণে এ্যান্টি অঙ্েিডন্ট রয়েছে, যা ফ্রি র্যাডিকালস প্রতিরোধ করতে সাহায্য করে। বুড়িয়ে যাওয়া ও সেল ডিজেনারেশনের অন্যতম কারণ এই ফ্রি র্যাডিকালস।
- আমলকী ত্বক, চুল ও চোখ ভাল রাখার জন্য উপকারী। এতে রয়েছে ফাইটো-কেমিক্যাল যা চোখের সঙ্গে জড়িও ডিজেনারেশন প্রতিরোধ করতে সাহায্য করে।
- আমলকী হজমে সাহায্য করে ও স্টমাক এ্যাসিডে ব্যালেন্স বজার রাখে।
- আমলকী লিভার ভাল রাখে, ব্রেনের কার্যকলাপে সাহায্য করে ফলে মেন্টাল ফাংশনিং ভাল হয়।
- আমলকী বস্নাড সুগার লেভেল নিয়ন্ত্রণে রেখে ডায়াবেটিস প্রতিরোধ করতে সাহায্য করে। কোলেস্টেরল লেভেলেও কম রাখাতে যথেষ্ট সাহায্য করে।
- হার্ট সুস্থ রাখে, ফুসফুসকে শক্তিশালী করে তোলে।
- শরীর ঠান্ডা রাখে, শরীরের কার্যৰমতা বাড়িয়ে তোলে, মাসল টোন মজবুত করে।
- লোহিত রক্তকণিকার সংখ্যা বাড়িয়ে তুলে দাঁত ও নখ ভাল রাখে।
- জ্বর, বদহজম, সানবার্ন, সানস্ট্রোক থেকে রৰা করে।
- আমলকীর জুস দৃষ্টি শক্তি ভাল রাখার জন্য উপকারী। ছানি প্রতিরোধ করতে সাহায্য করে। ব্রণ ও ত্বকের অন্যান্য সমস্যায় উপকারী।
- পেটের জ্বালা জ্বালাভাব কম রাখে। লিভারের কার্যকলাপে সাহায্য করে, পাইলস সমস্যা কমায়।
- শরীরের অপ্রয়োজনীয় ফ্যাট ঝরাতে সাহায্য করে। ব্রঙ্কাইটেসও এ্যাজমার জন্য আমলকীর জুস উপকারী।
- আমলকী গুঁড়োর সঙ্গে সামান্য মধু ও মাখন মিশিয়ে খাওয়ার আগে থেকে পারেন। খিতে বাড়াতে সাহায্য করে।
- এক গস্নাস দুধ বা পানির মধ্যে আমলকী গুঁড়ো ও সামান্য চিনি মিশিয়ে দিনে দু’বার খেতে পারেন। এ্যাসিডেটের সমস্যা কম রাখতে সাহায্য করবে।
- খাবারের সঙ্গে আমলকীর আচার খেতে পারেন। হজমে সাহায্য করবে।
- চোখ ওঠায়: কাঁচা আমলকীর রস দুই ফোঁটা করে দিনে দুইবার ব্যবহার করলে তিন দিনে চোখ ওঠা ভাল হয় ।
- বমি রোধে: বারবার বমি হলে শুকনো আমলকি এককাপ পানিতে ভিজিয়ে ঘন্টা দুই বাদে সেই পানিতে একটু শ্বেত চন্দন ও চিনি মিশিয়ে খেলে বমি বন্ধ হয়।
আমলকীর চাটনি
ধু ফল হিসেবে কাঁচা আমলকী নয়, বানিয়ে খেতে পারেন আমলকীর আচারও। এমনকি আমলকী দিয়ে বানানো যায় চমত্কার মোরব্বাও! রইলো আমলকীর মজাদার মোরব্বার রেসিপি।
উপকরণ :
আমলকী- আধা কেজি,
চিনি- আধা কেজি,
ভিনেগার- ২ কাপ,
আদা কুচি- ৩ টেবিল চামচ,
শুকনো মরিচ- ৮টা,
লবণ- পরিমাণমতো
চিনি- আধা কেজি,
ভিনেগার- ২ কাপ,
আদা কুচি- ৩ টেবিল চামচ,
শুকনো মরিচ- ৮টা,
লবণ- পরিমাণমতো
প্রস্তুত প্রণালী :
*আমলকীগুলো টুথপিক বা কাঁটা চামচ দিয়ে ছিদ্র ছিদ্র করে বা কেঁচে নিন।
*এরপর ফিটকিরি মেশানো পানিতে ৭-৮ ঘণ্টা ডুবিয়ে রাখুন। মাঝে মাঝে পানি পালটে দিন।
*ফিটকিরি মেশানো পানি থেকে আমলকীগুলো তুলে ভালো করে ধুয়ে নিন এবং পানি ঝরতে দিন।
*একটি পাত্রে পানি নিয়ে তাতে লবণ দিয়ে গরম করুন। পানি ফুটে উঠলে তাতে আমলকীগুলো দিয়ে দিন।
*১০ মিনিট পর পাত্রটি নামিয়ে ফেলুন এবং আবার পানি ঝরান।
*একটি পাত্র চুলার ওপর দিন। পাত্র গরম হয়ে গেলে তাতে ভিনেগার ঢেলে দিন।
*শুকনো মরিচের এক পাশে চিড়ে নিন। ভিনেগার গরম হয়ে এলে এতে আদা কুচি, মরিচ ও চিনি দিয়ে দিন।
*চিনি গলে গেলে আমলকীগুলো দিয়ে দিন। মাঝে মাঝে নেড়ে দিন।
*১০ মিনিট পর মোরব্বা চুলা থেকে নামিয়ে ফেলুন।
*মোরব্বা তৈরিতে চিনির পরিবর্তে গুড়ও ব্যবহার করতে পারেন। সেক্ষেত্রে গুড় আগেই গলিয়ে নিন।
*মোরব্বা ঠাণ্ডা হয়ে গেলে বয়ামে তুলে সংরক্ষণ করুন। এটা ফ্রিজে রাখলে বেশি দিন ভালো থাকবে।
*এরপর ফিটকিরি মেশানো পানিতে ৭-৮ ঘণ্টা ডুবিয়ে রাখুন। মাঝে মাঝে পানি পালটে দিন।
*ফিটকিরি মেশানো পানি থেকে আমলকীগুলো তুলে ভালো করে ধুয়ে নিন এবং পানি ঝরতে দিন।
*একটি পাত্রে পানি নিয়ে তাতে লবণ দিয়ে গরম করুন। পানি ফুটে উঠলে তাতে আমলকীগুলো দিয়ে দিন।
*১০ মিনিট পর পাত্রটি নামিয়ে ফেলুন এবং আবার পানি ঝরান।
*একটি পাত্র চুলার ওপর দিন। পাত্র গরম হয়ে গেলে তাতে ভিনেগার ঢেলে দিন।
*শুকনো মরিচের এক পাশে চিড়ে নিন। ভিনেগার গরম হয়ে এলে এতে আদা কুচি, মরিচ ও চিনি দিয়ে দিন।
*চিনি গলে গেলে আমলকীগুলো দিয়ে দিন। মাঝে মাঝে নেড়ে দিন।
*১০ মিনিট পর মোরব্বা চুলা থেকে নামিয়ে ফেলুন।
*মোরব্বা তৈরিতে চিনির পরিবর্তে গুড়ও ব্যবহার করতে পারেন। সেক্ষেত্রে গুড় আগেই গলিয়ে নিন।
*মোরব্বা ঠাণ্ডা হয়ে গেলে বয়ামে তুলে সংরক্ষণ করুন। এটা ফ্রিজে রাখলে বেশি দিন ভালো থাকবে।


EmoticonEmoticon