ঢাকা: সম্প্রতি বাংলানিউজের অফিসে এসেছিলেন যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী বাংলাদেশি আজহারুল ইসলাম লিটন নামের এক যুবক। পেশায় তিনি একজন রিয়েল এস্টেট এন্টারপ্রেইন্যার।
তবে তার আরও একটি পরিচয় আছে। যুক্তরাষ্ট্রে তিনি কাজ করেন নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার নিয়ে। বিশেষ করে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের মাধ্যমে দূষণ ও কার্বন নিঃসরণবিহীন অফিস, বসতবাড়ি কিংবা স্কুল কলেজ সহ অন্যান্য স্থাপনা নির্মাণে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে কাজ করছেন দীর্ঘ দিন ধরেই।
যুক্তরাষ্ট্রের পিটসবার্গ শহরে তার প্রতিষ্ঠান নির্মিত পরিবেশবান্ধব বসতবাড়িগুলো ইতোমধ্যেই ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। ‘নেট জিরো’ আবাসন নির্মাণই তার লক্ষ্য।
একই সঙ্গে আজহারুল ইসলাম লিটন যুক্তরাষ্ট্রের এনার্জি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল কমিউনিটি আউটরিচ সেন্টারের (ইইসিও) উপদেষ্টা বোর্ডের সদস্য। এর সভাপতি যুক্তরাষ্ট্রের আইন প্রণেতা সিনেটর জিম ফার্লো।
বাংলানিউজের সঙ্গে কথোপকথনের সময় জানালেন মানুষের একটু সচেতনতাই পারে ৭০-৯০ শতাংশ জ্বালানি সাশ্রয় করতে। বিশেষ করে ব্যক্তিগত জীবনাচার (লাইফ স্টাইল) এবং ভবন নির্মাণ পরিকল্পনায় জ্বালানি সাশ্রয়ের বিষয়টি মাথায় থাকলেই বিষয়টি সম্ভব।
উন্নত বিশ্বে এখন সাশ্রয়ী ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার উপযোগী অবকাঠামো নির্মাণই এ মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্ব পাচ্ছে বলেও জানালেন তিনি।
লিটনের সঙ্গে কথা বলার সময় উঠে এলো কিভাবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার করে ব্যক্তিগত স্বাচ্ছ্যন্দের কোনো ব্যাঘাত না ঘটিয়েই অফিসে কিংবা বাড়িতে নিয়মিত ব্যবহৃত জ্বালানির ৭০-৯০ শতাংশ সাশ্রয় সম্ভব।
এ প্রসঙ্গে তিনি জানালেন, যুক্তরাষ্ট্রের বিল্ডিং এনার্জি এফিসিয়েন্সি সার্টিফিকেশন (লিড)‘র কথা।
লিড জ্বালানি সাশ্রয়ের একটি সার্টিফিকেশন। একটি ভবন কতখানি জ্বালানি সাশ্রয়ী বা জ্বালানি ব্যবহারে ভবনটি কতখানি পরিবেশবান্ধব তার ওপর দেয়া সনদ দেয় লিড।
এ রকম একটি সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশেও থাকতে পারে বলে মত প্রকাশ করলেন লিটন।
পাশাপাশি ‘এনার্জি ইফিসিয়েন্ট কনজিউমার প্রোডাক্ট’ ব্যবহারের পরামর্শও দেন তিনি।
তিনি জানান, এর মাধ্যমে একজন সহজেই তার টিভি কিংবা ফ্রিজে ব্যবহৃত বিদ্যুতের ৩০-৪০ শতাংশ পর্যন্ত সাশ্রয় করতে পারবেন।
এ প্রসঙ্গে জানালেন এনার্জি স্টার সার্টিফিকেশনের কথা। যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৯২ সালে শুরু হওয়া এ সার্টিফিকেশন এখন গ্রহণ করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে শুরু করে পৃথিবীর প্রায় সব উন্নত দেশেই।
টিভি ফ্রিজ সহ অন্যান্য ইলেক্ট্রনিক হোম অ্যাপ্লায়ান্সের ক্ষেত্রে এনার্জি স্টার লোগোই কাউকে নিশ্চয়তা দেবে ওই সামগ্রী কতখানি জ্বালানি সাশ্রয়ী। এর মানে কোনো ফ্রিজের গায়ে যদি এনার্জি স্টারের লোগো থাকে। তবে ওই লোগোতে লেখা থাকবে এই ফ্রিজটি কতখানি বিদ্যুত সাশ্রয়ী।
একই সঙ্গে লাইফ স্টাইলে ‘জিরো ওয়েস্ট’ চর্চার ওপরও গুরুত্ব দিলেন এই তরুণ জ্বালানি গবেষক। জিরো ওয়েস্ট মানে একজন মানুষ সচেতনভাবে লক্ষ্য রাখবেন তার মাধ্যমে যেন সবচেয়ে কম ময়লা আবর্জনা সৃষ্টি হয়।
এছাড়া বাড়ি নির্মাণে ‘গ্রিন রুফ’ টেকনোলজির মাধ্যমে একজন এই ব্যস্ত শহরেই পেতে পারেন সবুজের ছোঁয়া। পাশাপাশি এর মাধ্যমে ভবনের তাপমাত্রাও নিয়ন্ত্রিত হবে প্রাকৃতিকভাবে।
আলাপচারিতায় উঠে এলো ভবন নির্মাণে প্যাসিভ ডিজাইনিংয়ের কথাও।
প্যাসিভ ডিজাইনিংয়ের মাধ্যমে একটি বাড়িকে ৭০-৯০ শতাংশ পর্যন্ত বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী করা সম্ভব বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
প্যাসিভ ডিজাইনিংয়ের মাধ্যমে একটি বাড়িকে ৭০-৯০ শতাংশ পর্যন্ত বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী করা সম্ভব বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
জানালেন, প্যাসিভ ডিজাইনিংয়ের সাহায্যে বানানো বাড়িতে থাকবে সোলার সিস্টেমের ব্যবহার। এছাড়া এসব বাড়ির দেয়াল, মেঝে ও ছাদ এমন প্রযুক্তিতে নির্মাণ করা হবে যেন প্রাকৃতিক ভাবেই ঘরের তাপ ও আলোর মাত্রা পরিবেশ অনুযায়ী পরিবর্তিত হতে পারে।
এছাড়া দৈনন্দিন জীবনে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের জন্য হাইব্রিড টেকনোলজি ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
তার মত একটি বাড়িতে ইলেক্ট্রেসিটি লাইটও থাকতে পারে আবার সোলার লাইটও থাকতে পারে। যখন যেটা ব্যবহার সুবিধাজনক তখন তা ব্যবহার করাই হবে বুদ্ধিমত্তার কাজ।
এছাড়া জ্বালানি বা বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে ‘কো-জেনারেশন’ টেকনোলজি ব্যবহারের কথা উল্লেখ করেন তিনি।
যেমন ডেনমার্কের একটি বিদ্যুত কেন্দ্রে এই পদ্ধতিতে প্রথমে খড় পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়। আবার এ থেকে উদ্ভূত তাপ সরবরাহ করা হয় আশপাশের গ্রিনহাউজগুলোতে। ফলে একই সঙ্গে উৎপাদন হচ্ছে বিদ্যুৎ ও তাপ।
তিনি উল্লেখ করেন জ্বালানি ‘রি-জেনারেশন’ এর কথাও। সাইকেলের প্যাডেল চালানো, গাড়ির ব্রেক চাপা, এমনকি লিফটের ওঠানামা কাজে লাগিয়েও স্বল্প মাত্রার বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব রিজেনারেশনের মাধ্যমে।
তিনি উল্লেখ করেন জ্বালানি ‘রি-জেনারেশন’ এর কথাও। সাইকেলের প্যাডেল চালানো, গাড়ির ব্রেক চাপা, এমনকি লিফটের ওঠানামা কাজে লাগিয়েও স্বল্প মাত্রার বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব রিজেনারেশনের মাধ্যমে।
তিনি বলেন, ‘আসলে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে প্রতিদিনই কোনো না কোনোভাবে বিদ্যুতের প্রয়োজন আছেন। তবে যদি আমরা একটু সচেতন হয়ে এসব প্রযুক্তি ব্যবহার করি তবে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের বিদ্যুতের খরচ সাশ্রয় করা সম্ভব ৭০-৯০ শতাংশ। আর মিলিতভাবে এতে সাশ্রয় হবে পুরো দেশের জ্বালানি চাহিদার’।
বিকল্প জ্বালানির উৎস হিসেবে তিনি জানালেন পানি, বাতাস, সৌরবিদ্যুত ও ফুয়েল সেলের কথা।
এমনকি ঢাকা শহরের সুয়ারেজ ব্যবস্থাকে কাজে লাগিয়ে সুয়ারেজে উৎপন্ন মিথেন গ্যাসের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কথাও জানালেন।
শুধু মানুষের মলমূত্র থেকে ফুয়েল সেল টেকনোলজি ব্যবহার করে একই সাথে সাতটি জিনিস বিদ্যুৎ,হাইড্রোজেন গ্যাস, গরম ও ঠাণ্ডা বায়ু,সুপেয় পানি, উর্বর মাটি এবং কার্বন ডাই অক্সাইড উৎপাদন সম্ভব। প্রত্যেকটি জিনিসই বাণিজ্যিকভাবে অত্যন্ত মূল্যবান। ঢাকা শহরের কোটি লোকের নির্গত মলমূত্রই এ নগরীর জ্বালানি সমস্যার সমাধানে গ্রহণযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারে বলে জানান তিনি। এছাড়া গারবেজ থেকেও একই ফল লাভ সম্ভব।
ব্যক্তি, সরকার ও বাণিজ্যিক উদ্যোগেও এ সব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সম্ভব বলে জানান তিনি। তবে দেশে এ ধরনের প্রকল্প গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তিনি প্রথমে সরকারের সুদৃষ্টি কামনা করেন।
ব্যক্তি, সরকার ও বাণিজ্যিক উদ্যোগেও এ সব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সম্ভব বলে জানান তিনি। তবে দেশে এ ধরনের প্রকল্প গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তিনি প্রথমে সরকারের সুদৃষ্টি কামনা করেন।
আজহার লিটন বলেন, ‘বিশেষ করে এ ব্যাপারে সরকার যদি একটি গাইডলাইন বা নীতিমালা নির্ধারণ করে দেন তাহলেই বিষয়টি সবচেয়ে কার্যকর হবে।’
তিনি এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর সুদৃষ্টি কামনা করেন। নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত আগ্রহ নানা সময়ে প্রকাশ পেয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সম্প্রতি ভুটানের রাজধানী থিম্পুতে ১৬তম সার্ক শীর্ষ সম্মেলনের উদ্বোধনী ভাষণেও প্রধানমন্ত্রী নবায়নযোগ্য জ্বালানি শক্তির ওপর গুরুত্ব দেন।
এছাড়া পৃথিবীতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার এখন শুধু উন্নত দেশগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। গোটা বিশ্বেই বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার মূল স্রোতের অংশ হয়ে উঠছে।
‘ গ্লোবাল ফিউচার রিপোর্ট’-এ বিশেষজ্ঞরা এই প্রবণতার একটি সার্বিক চিত্র তুলে ধরেছেন। কয়লা বা তেলের মতো জীবাশ্মভিত্তিক জ্বালানি অথবা প্রচলিত পরমাণু শক্তির ভবিষ্যত যে অন্ধকার, গোটা বিশ্বেই ক্রমশ সেই উপলব্ধি ছড়িয়ে পড়ছে। হাতেনাতে তার ফলও পাওয়া যাচ্ছে।
প্রতিবছর বিকল্প জ্বালানির ক্ষেত্রে যে পরিমাণ বিনিয়োগ করা হচ্ছে, তার অঙ্ক সংখ্যা কয়লা ও পরমাণুভিত্তিক বিদ্যুত কেন্দ্রগুলোর জন্য সম্মিলিত বিনিয়োগের তুলনায় বেশি। এই প্রবণতা আরও বাড়বে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
গোটা বিশ্বে বিদ্যুত সরবরাহের ক্ষেত্রে বিকল্প জ্বালানির মাত্রা ইতোমধ্যেই প্রায় ২৫ শতাংশ ছুঁয়েছে।
‘গ্লোবাল ফিউচার রিপোর্ট’ অনুযায়ী নবায়নযোগ্য জ্বালানির ক্ষেত্রে বিনিয়োগের প্রশ্নে চীনের অবস্থান শীর্ষে। আগামী দশকগুলোতেও এর কোন পরিবর্তনের সম্ভাবনা নেই। বিশেষ করে বায়ু ও সৌর বিদ্যুতের ক্ষেত্রে তারা বিশাল অঙ্কের অর্থ ঢালছে।
উন্নত দেশগুলোতে ঘরবাড়িতে জ্বালানি সাশ্রয় থেকে শুরু করে সাইকেল, পথচারী ও জন পরিবহনকে গাড়ির তুলনায় অগ্রাধিকার দেওয়ার মতো পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। এসব কাজে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহারও বাড়াচ্ছে তারা।
এর মাধ্যমে শহর কর্তৃপক্ষ ও নাগরিকদের অনেক সুবিধা হচ্ছে।জ্বালানি আমদানির ওপর শহরগুলোর নির্ভরতা কমে আসছে। স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থান বাড়ছে। এর ফলে পরিবেশ সংরক্ষণও হচ্ছে।
প্রায় সব সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, মানুষ এমন বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার চান।
বিদ্যুৎ, বাড়িঘর গরম রাখার জন্য উত্তাপ, শিল্পক্ষেত্র ও পরিবহন – গোটা বিশ্বে এই মুহূর্তে এই সব ক্ষেত্রে প্রায় ১৭ শতাংশ জ্বালানির চাহিদা মেটাচ্ছে বিকল্প জ্বালানি। বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০৫০ সালের মধ্যে এই অনুপাত আরও অনেক বেড়ে যাবে।
সৌরশক্তি ও বায়ুশক্তির অনুপাত হবে বিশাল। এ দুটি উৎস থেকেই ২০ থেকে ২৫ শতাংশ করে জ্বালানি পাওয়া যাবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির বাকিটা আসবে বায়ো মাস, জলশক্তি এবং জিওথার্মাল উৎস থেকে। ধারণা করা হচ্ছে ২০৫০ সালের মধ্যে গোটা বিশ্বের প্রায় ৮০ শতাংশ চাহিদা মেটাবে বিকল্প জ্বালানি।
জলবায়ু পরিবর্তন রোধে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে হবে, এই প্রবণতার সপক্ষে আর্থিক সুবিধাও একটা বড় ভূমিকা পালন করছে।
গত কয়েক বছরে বিশেষ করে সৌরশক্তি ও বায়ুশক্তি থেকে জ্বালানির মূল্য অনেক কমে গেছে। এমনকি জীবাশ্মভিত্তিক ও পরমাণু জ্বালানির তুলনায় এর মূল্য এখনই কিছুটা কম। বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী কয়েক দশকে বিকল্প জ্বালানি আরও সস্তা হয়ে যাবে।
এখন পর্যন্ত বাড়িঘর গরম রাখার জন্য উত্তাপ এবং পরিবহন ক্ষেত্রে এর প্রয়োগ এখনো সীমিত। ভবিষ্যতে নতুন ঘরবাড়িতে জ্বালানির চাহিদা হবে অনেক কম। ছাদের উপর সৌর প্যানেল থেকেই সেই চাহিদার সিংহভাগ মেটানো যাবে। আগামী দশক থেকে পরিবহন ক্ষেত্রেও ইলেকট্রিক এবং ফুয়েল সেল চালিত যানবাহনের সংখ্যা বাড়বে বলে বিশেষজ্ঞরা আশা করছেন। চীন ও ভারতের মতো বাজারে এমন গাড়ির চাহিদা এখনই তৈরি হয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে আজহার লিটন বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও এর ব্যবহার বৃদ্ধির বিষয়ে উদ্যোগ গ্রহণ করার জন্য সরকার ও বেসরকারি উদ্যোক্তাদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।


EmoticonEmoticon