আবে যমযম – দুই।




নাফরমানির দরুন যমযম এর পানি বন্ধ:
যমযম ইঁদারা (কূপ), প্রায় চার হাজার বছর আগের কথা। কিন্তু এর কয়েক শতাব্দী পর হঠাৎ করে কুপের পানি বন্ধ হয়ে যায়। তখন কাবা শরীফের তত্ত্বাবধানে ছিল যারহাম গোত্র। তারা শেষ দিকে এসে কাবা শরীফের সম্মানের কথা ভুলে যায় এবং তার প্রতি নানা বেয়াদবি ও অন্যায় আচরণ করতে থাকে। তাদের এহেন গর্হিত কাজ সহ্য না করতে পেরে ‘খোজায়া’ গোত্রের লোকেরা যারহামদের ওপর আক্রমণ চালায় এবং হেরেম থেকে তাদের বের করে দেয়। যাওয়ার সময় যারহাম গোত্র কূপটিকে নিশ্চিহ্ন করে দিয়ে যায়। সেই থেকে প্রায় পাঁচশ’ বছর যমযম ইঁদারা (কূপ)টি অজ্ঞাত অবস্হায় পড়ে থাকে। কেউ তার সন্ধান দিতে পারেনি। খ্রিষ্টীয় চার শতাব্দীতে এসে রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহিস ওয়াসাল্লাম)-এর পিতামহ হযরত আবদুল মুত্তালিব (আলাইহিস সালাম)কালের অতল গহ্বরে হারিয়ে যাওয়া সেই কূপ পুনরুদ্ধার করেন। এটি তার জীবনের একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। এক রাতে তিনি কাবার আঙ্গিনায় শায়িত অবস্হায় স্বপ্নে দেখেন যে, একজন লোক তাকে প্রথম রাতে ‘তাইবা’, দ্বিতীয় রাতে ‘বাররা’ এবং তৃতীয় রাতে ‘মজনুনা’ খনন করার নির্দেশ দিয়ে অন্তর্হিত হয়ে গেলেন। ওইগুলো কী জানতে চাইলে তিনি কোনো উত্তর পেলেন না। এই তিনটি শব্দই যমযম কুপের নাম। ‘তাইবা’ অর্থাৎ পবিত্র, ‘বাররা’ অর্থাৎ নেক, আর ‘মজনুনা’ অর্থাৎ সংরক্ষিত। এরপর চতুর্থ রাতে পুনরায় ওই ব্যক্তি এসে তাকে যমযম ইঁদারা (কূপ) খননের নির্দেশ দিলেন। আবদুল মুত্তালিব(আলাইহিস সালাম) জিজ্ঞেস করলেন-তা কী? উত্তর এলো-‘যার পানি কখনো নিঃশেষ হয় না, যার তলদেশ পাওয়া যায় না, যা হাজীদের পানি সরবরাহ করে, রক্ত ও গোময়ের মধ্যে, শুষ্ক বক্ষধারী কাকের ঠোকরের কাছে, নামল বন্তীর পার্শ্বে।’ এ নির্দেশ পেয়ে তিনি ঘুম থেকে জেগে একমাত্র পুত্র হারেসকে সঙ্গে নিয়ে স্বপ্নে নির্দেশিত স্হানে গেলেন। খননকার্য শুরু করলেন। প্রথমে কূপটির সামান্য চিহ্ন পরিলক্ষিত হলো। এ সময় কুরাইশরা দাবি জানাল, এটা তাদের পুর্বপুরুষ হযরত ইসমাঈল (আলাইহিস সালাম)-এর কূপ; এতে তাদের অধিকার রয়েছে; খনন কাজে তাদেরও শরিক করতে হবে। পরে অবশ্য আপসে তারা এ কাজের জন্য আবদুল মুত্তালিব আলাইহিস সালাম কেই যোগ্য মনে করেন। আবদুল মুত্তালিব আলাইহিস সালাম কূপ খননকালে তার মধ্যে ‘নাযেদ’ নামক একটি মুর্তি পরিত্যক্ত অবস্হায় পান। মুর্তিটি যমযম ইঁদারা (কূপ) থেকে সরিয়ে ফেললে পানি প্রবাহ আবার শুরু হয়। এ মুর্তিটি রেখে গিয়েছিল যারহাম গোত্রের লোকেরা। তাদের এ নাফরমানির দরুন আল্লাহ যমযমের পানি বন্ধ রেখেছিলেন।সেদিন থেকে আজ এবং কেয়াকত দিবস পর্যন্ত লক্ষ্যকোটি মানুষের পিপাসা নিববারণের এক অফুরন্ত উৎস হয়ে খাকবে এই পবিত্র যমযম ইঁদারা (কূপ)।

কারামাতীদের দ্বারা যমযম কুপের ক্ষতি সাধন:
২৯০ হিজরী সনে কারামাতীরা সিরিয়ার ব্যপক জনসংখ্যাকে বিভ্রান্ত করে সেখানে সামাজিক বিশৃঙ্খলা ঘটাতে সক্ষম হয়।এক পর্যায়ে সেখানে তারা ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ ঘটিয়ে ক্ষমতা কুক্ষিগত করে নেয়। কারামতী শিয়া সম্প্রদায়ের একটি ফেরকা বা ভাগ। কারামাতী সম্প্রদায় এরা মুসলমান দাবীকরে বটে কিন্তু তাদের আকীদা বিশ্বাস সম্পূর্ন ইসলাম পরিপন্থী। যেমন এরা আখিরাত বিশ্বাস করেনা। এরা বিশ্বাস করে, বেহেস্ত দোযখ দুনিয়াতেই। আখেরাতে শাস্তি-পুরস্কার বলতে কিছু নেই। এরা ইসলামের হারাম হালালকে অস্বীকার করে। ব্যভিচার ও মদপনে উতসাহিত করে। তারা মনে করে, মানুষকে আল্লাহ তা’আলা সৃষ্টিই করেছেন ভোগ-বিলাসের জন্য এবং ইসলামের হারাম হালালের বিষয়টি অবান্তর। এরপর ও মুসলমানদের ধোকা দিতে এরা নিজেদেরকে মুসলমান দাবী করে। প্রকৃতপক্ষে এরা হিন্দু, খৃস্টান ও ইহুদীদের চেয়ে ও জঘন্য, ছদ্মবেশী ভয়ংকর। আব্দুল্লাহ এবং মাইমুন নামে দু’জন আরব এ মতবাদের উদ্ভাবক। কোন আরব দেশ থেকে তৃতীয় হিজরী শতকে এদের উত্থান শুরু। তবে এই মতবাদের মুল জনক একজন খৃষ্টান যাজক। ইহুদীদের সমর্থন ও সহযোগিতাও রয়েছে এদের পিছনে। কারো মতে ইরানের এক বড় অংশ এই কারামতী মতবাদের অনুসারী। ৩১১ হিজরী সনে এরা বসরা ও কুফা শহর ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ ও লুটতরাজ চালিয়ে শহর দু’টিকে ধ্বংসস্তুপে পরিনত করে। আবু তাহের নামের এক কুখ্যাত দস্যুকে তারা সে সময় ক্ষমতায় বসিয়ে মক্কা মুয়াজ্জিমাকেও দখলে নিতে সক্ষম হয়েছিল এই কারামাতিরা। আবুতাহেরের বাহিনী হাজ্বিদের মালামাল লুটের পাশাপাশি কাবাঘরেরক্ষতি সাধন করে তারা যমযম ইঁদারা (কূপ) ভাঙ্গে ও হাজরে আসওয়াদ নিয়ে যায়।

Image result for যমযম কুপের গভীরতা ৫১ ফুট
Previous
Next Post »