মহান আল্লাহ পাক উনার প্রিয় বান্দী হযরত সাইয়্যিদাহ হাজেরা আলাইহিস সালাম উনার ঘরে হযরত ইসমাঈল আলাইহিস সালাম তিনি বিলাদত শরীফ লাভ করেন, তখন উনার ললাট মুবারক-এ নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার দীপ্ত নূর মুবারক দেখা যাচ্ছিলো। হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম তিনি উনার আহলিয়া হযরত হাজেরা আলাইহাস সালাম এবং উনার সম্মানিত ছেলে হযরত ইসমাঈল আলাইহিস সালাম উনাদেরকে কা’বা শরীফ-এ রেখে আসলেন। এদিকে যখন উনাদের নিকটে যে খাদ্য ও পানীয় ছিলো তা শেষ হয়ে গেলো। উনারা উভয়েই পিপাসায় কাতর হয়ে পড়লেন। এরপর হযরত হাজেরা আলাইহাস সালাম তিনি কখনো সাফা পাহাড়ে কখনো মারওয়া পাহাড়ে উঠেন, উভয় পাহাড়ের মাঝখানে দাঁড়ান যাতে হযরত ইসমাঈল আলাইহিস সালাম তিনি দৃষ্টির আড়ালে না পড়েন। হযরত হাজেরা আলাইহাস সালাম তিনি ফিরে এসে দেখতে পান হযরত ইসমাঈল আলাইহিস সালাম উনার পা মুবারক-এর আঘাতে যে অংশ গর্ত হয়েছে তা থেকে পানি বের হচ্ছে। হযরত হাজেরা আলাইহাস সালাম তিনি সেই পানি চতুর্দিক থেকে বন্ধ করতে লাগলেন এবং বলতে লাগলেন যমযম যমযম। অতঃপর উনারা সেই পানি পান করলেন।
এই পানি মুবারক-এর অনেক বৈশিষ্ট্যের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, এই যমযম-এর পানি পিপাসাও দূর করে ক্ষুধাও নিবারণ করে। দুধের ন্যায় ইহা পান ও আহার উভয় ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়। ইহার স্বাদ উষ্ট্রীর দুধের ন্যায়। সুবহানাল্লাহ! হযরত হাজেরা আলাইহাস সালাম তিনি এবং উনার সন্তান হযরত ইসমাঈল আলাইহিস সালাম উনারা দীর্ঘদিন পর্যন্ত এভাবে দিন অতিবাহিত করেন। অতঃপর জুরহুম গোত্রের লোকেরা পানির সন্ধানে এখানে এসে পৌঁছলো এবং পানি পেয়ে এখানে বসতি স্থাপন করলো। পরবর্তীতে হযরত ইসমাঈল যবীহুল্লাহ আলাইহিস সালাম তিনি সেই গোত্রেই নিকাহ মুবারক করলেন।
তিনি নবী হিসেবে আমেলিকা, জুরহুম ও ইয়ামেনবাসীদের প্রতি প্রেরিত হয়েছেন। একশত ত্রিশ বছর বয়স মুবারক-এ হযরত ইসমাঈল যবীহুল্লাহ আলাইহিস সালাম তিনি বিছাল শরীফ লাভ করেন। (মাদারিজুন নুবুওওয়াত)
বর্ণিত আছে, হযরত ইসমাঈল যবীহুল্লাহ আলাইহিস সালাম উনার বিছাল শরীফ-এর পর উনার বংশ পরম্পরায় কা’বা শরীফ-এর খিদমত করতে থাকেন। দীর্ঘকাল পর হযরত ইসমাঈল যবীহুল্লাহ আলাইহিস সালাম এবং বনী জুরহুমের মধ্যে মতানৈক্য ও বিবাদের সূচনা হয়। এই বিবাদ ফায়সালা করা সম্ভব হলো না। অবশেষে জুরহুম গোত্রের লোকেরা মক্কা শরীফ-এর কর্তৃত্ব কেড়ে নেয় এবং তাদের শাসকরা হযরত ইসমাঈল যবীহুল্লাহ আলাইহিস সালাম উনার বংশধরের উপর অত্যাচার নিপীড়ন শুরু করে। এই জুলুমবাজ জুরহুম সম্প্রদায়ের অত্যাচারে হযরত ইসমাঈল যবীহুল্লাহ আলাইহিস সালাম উনার বংশধরগণ মক্কা শরীফ থেকে হিজরত করে আরবের বিভিন্ন স্থানে গিয়ে বসতি স্থাপন করেন। যখন বনী জুরহুমের অন্যায়, অত্যাচার, পাপচারিতা ও কা’বা শরীফ-এর অসম্মানকরণের সীমা ছাড়িয়ে যায়, তখন তাদের উপর খোদায়ী আযাব-গযব ও মহামারিতে তারা ধ্বংস হতে থাকে এবং এদিকে মক্কা শরীফ-এর চার পাশের সমস্ত আরব গোত্রসমূহ তাদের সাথে মুকাবিলার উদ্দেশ্যে দ-ায়মান হয়। অবশেষে জুরহুমরা মক্কা শরীফ ত্যাগ করে পলায়ন করে। কিন্তু যখন তারা মক্কা শরীফ ত্যাগ করা শুরু করে, তখন কা’বা শরীফ-এ অবস্থিত মূল্যবান দ্রব্যাদি পবিত্র যমযম কূপে নিক্ষেপ করে এবং যমযম কূপকে মাটি দ্বারা ভরাট করে, যার কারণে যমযম কূপের কোনো চিহ্ন থাকে না। বনী জুরহুম মক্কা শরীফ থেকে চলে যাওয়ার পর বনী ইসমাঈল আলাইহিস সালাম উনারা পুনরায় মক্কা শরীফ-এ ফিরে আসেন এবং বসতি স্থাপন করেন। কিন্তু যমযম কূপ নিশ্চিহ্ন রয়ে গেলো। যমযম কূপের প্রতি কেউ নজর দিলেন না। কালের আবর্তনে এর নাম নিশানা পর্যন্ত বিলুপ্ত হয়ে যায়।
হযরত আব্দুল মুত্তালিব আলাইহিস সালাম তিনি যখন কা’বা শরীফ-এর দেখাশুনা করতেন তখন মহান আল্লাহ পাক উনার দয়া ও ইহসানে তিনি পবিত্র যমযম কূপ পুনরুদ্ধার করলেন।
এ প্রসঙ্গে হযরত আব্দুল মুত্তালিব আলাইহিস সালাম তিনি বলেন, “আমি হাতিমে ঘুমিয়ে ছিলাম এমন সময় দেখলাম এক আগন্তুক আমার নিকটে এলেন এবং স্বপ্নে আমাকে বললেন احفربرة অর্থ: কূপটি খনন করুন। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, কোন কূপটি? অতঃপর ওই লোকটি প্রশ্নের জওয়াব না দিয়ে চলে গেলেন। পরের দিন আবার ওই স্থানে ঘুমালাম, স্বপ্নে দেখলাম ওই ব্যক্তি এসে বললেন, احفرالمضنونة ‘মাদ্বনূনাহ খনন করুন’। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, মাদ্বনূনাহ কি? কিন্তু লোকটি জাওয়াব না দিয়ে চলে গেলেন। তৃতীয় দিন পুনরায় একই জায়গায় ঘুমালাম। দেখলাম ওই ব্যক্তি এসে বললেন, احفرطيبة ‘পবিত্র স্থান’ খনন করুন। আমি প্রশ্ন করলাম ‘ত্বইয়ীবাহ’ কি? কিন্তু লোকটি চলে গেলেন। চতুর্থ দিন ঠিক একই স্থানে ঘুমালাম, পুনরায় স্বপ্নে দেখতে লাগলাম ওই ব্যক্তি এসে বলছেন احفر زمزم ‘যমযম খনন করুন’। আমি প্রশ্ন করলাম যমযম কি? তিনি এবার জাওয়াব দিলেন,
لاتنزف ابدا ولاتزم تسقى الحجيج الاعظم.
অর্থ: “যমযম এটি একটি পবিত্র পানির কূপ মুবারক, যার পানি কখনো নষ্ট হয় না এবং কমেও না। অসংখ্য অগণিত হাজীদের পানির পিপাসা নিবৃত্ত করে।”
অলৌকিক ঘটনার বাস্তব প্রতিফলন। আমার আম্মাজান আলাইহাস সালাম আমার বিলাদত শরীফ-এর সময় দেখেছিলেন একখানা বরকতময় নূর যমীনে তাশরীফ নিলেন এবং সেই নূর মুবারক-এর আলোকে শাম দেশের দালান কোঠাগুলোকে আলোকিত করলো তা তিনি সুস্পষ্টভাবে দেখতে পেলেন।” সুবহানাল্লাহ! (মুসনাদে আহমদ)
এই থেকেই প্রমাণ হয় হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজেই নিজের বিলাদত শরীফ উপলক্ষে খুশি করেছেন। তাই আমাদের জন্যও উনার বিলাদত শরীফ তথা ঈদে মীলাদুন নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পালন করা ফরয।
অতঃপর সেই স্থানটির কিছু নিদর্শন ও চিহ্ন বলে দিয়ে সেই স্থান খুঁড়তে বললেন। এভাবে বারবার স্বপ্নে দেখানো এবং নিদর্শন দেখানোর ফলে হযরত আব্দুল মুত্তালিব আলাইহিস সালাম তিনি কুরাইশদের সাথে পরামর্শ করলেন এবং উনার স্বপ্নের কথা তাদের বললেন যে, তিনি এই স্থান খুঁড়তে চান। কুরাইশদের অনেকেই বিরোধিতা করে। কিন্তু হযরত আব্দুল মুত্তালিব আলাইহিস সালাম তিনি এই বিরোধিতার পরওয়া না করে বরং কোদাল ইত্যাদি নিয়ে নিজপুত্র হযরত হারিস আলাইহিস সালামসহ ওই স্থানে পৌঁছলেন এবং চিহ্নিত স্থান খুঁড়তে শুরু করলেন। তিনি নিজে খুঁড়ছিলেন এবং উনার ছেলে হযরত হারিস আলাইহিস সালাম তিনি মাটি তুলে ফেলছিলেন। তিনদিন খুঁড়ার পর এর চিহ্ন দেখা গেলো। হযরত আব্দুল মুত্তালিব আলাইহিস সালাম তিনি খুশিতে তাকবীর ধ্বনি দিলেন এবং বললেন,
هذا طوى اسماعيل عليه السلام.
অর্থ: “এটি হযরত ইসমাঈল আলাইহিস সালাম উনার কূপ মুবারক।”
‘খাছায়িছূল কুবরা’ গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে, “হযরত আব্দুল মুত্তালিব আলাইহিস সালাম তিনি যখন কূপ খনন করছিলেন তখন কুরাইশরা বললো, হে হযরত আব্দুল মুত্তালিব আলাইহিস সালাম! আপনি কি করছেন? তিনি বললেন, আমাকে যমযম খনন করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। অতঃপর যখন যমযম-এর পানি বের হয়ে আসলো। তখন কুরাইশরা বললো হযরত ইসমাঈল আলাইহিস সালাম উনার পানিতে আমাদেরও অংশ আছে। হযরত আব্দুল মুত্তালিব আলাইহিস সালাম তিনি বললেন: এতে তোমাদের কোনো অংশ নেই। একান্তভাবে এটা আমার। তখন কুরাইশরা বললো, আচ্ছা আপনি এটার একটা ফায়ছালা করে দিন।
হযরত আব্দুল মুত্তালিব আলাইহিস সালাম তিনি বললেন ঠিক আছে, ফায়ছালা করা হবে। কুরাইশরা আরো বললো, আচ্ছা আমরা আমাদের এবং আপনাদের মধ্যে বনী সা’দ ইবনে হুযায়ম-এর অতন্দ্রীয়কে সালিস মেনে নিবো। সে মতে হযরত আব্দুল মুত্তালিব আলাইহিস সালাম তিনি কয়েকজন ছেলেকে নিয়ে এবং কুরাইশদের প্রত্যেক পরিবার থেকে কয়েক ব্যক্তি সিরিয়ার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়ে গেলেন। সিরিয়ার পথে বহুদূর বিস্তৃত ঘাস পানিহীন বিশাল মরুভূমি ছিলো। সেখানে পৌঁছার পর হযরত আব্দুল মুত্তালিব আলাইহিস সালাম ও উনার সঙ্গী সাথীদের পানি শেষ হয়ে গেলো। জীবন বিপন্ন দেখে উনারা কুরাইশ পক্ষের নিকট পানি চাইলেন। কুরাইশরা বললেন, আমরা তোমাদের পানি দিতে পারি না। কারণ আমরাও এরূপ পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে পারি। হযরত আব্দুল মুত্তালিব আলাইহিস সালাম তিনি সঙ্গীদের জিজ্ঞাসা করলেন এখন তোমাদের কি মত? তারা বললো আমরা আপনারই অনুসরণ করবো, কারণ আপনি সকলেরই মাথার তাজ, আমাদের আপনি রাহবার, পথ প্রদর্শক। হযরত আব্দুল মুত্তালিব আলাইহিস সালাম তিনি বললেন, প্রত্যেকেই তার কবর খনন করবে কেউ মারা গেলে তার সঙ্গী-সাথী তাঁকে কবরস্থ করবে। অবশেষে শেষ ব্যক্তি তার সঙ্গীকে কবরস্থ করবে। এক ব্যক্তির কবরবিহীন শুধু ইন্তিকাল সকলের কবরবিহীন ইন্তিকালের চেয়ে অনেক উত্তম। সে মোতাবিক সকলেই কবর খনন করলেন। অতঃপর হযরত আব্দুল মুত্তালিব আলাইহিস সালাম তিনি বললেন, মহান আল্লাহ পাক উনার ক্বসম! আমরা তো নিজেদেরকে মৃত্যুর হাতে সোপর্দ করেছি। এই অবস্থায় আমরা পানির খোঁজে বের হইনা কেনো? ইনশাআল্লাহ আল্লাহ পাক তিনি আমাদের জন্য পানির ব্যবস্থা করে দিবেন।
হযরত আব্দুল মুত্তালিব আলাইহিস সালাম তিনি সঙ্গী সাথীদের বললেন, যাত্রা করো। সকলেই পুনরায় রওয়ানা হলেন। কিন্তু আল্লাহ পাক উনার কি কুদরত হযরত আব্দুল মুত্তালিব আলাইহিস সালাম তিনি উনার উষ্ট্রীর পিঠে বসতেই উষ্ট্রী হোঁচট খেলো এবং তার পায়ের নিচ থেকে সুমিষ্ট পানির ঝর্ণা বের হতে লাগলো। এরপর সকলেই আপন আপন উষ্ট্রী বসিয়ে দিলেন। উনারা নিজেরা পানি পান করলেন এবং জন্তুগুলোকেও পানি পান করালেন। অতপর কাফিলার সমস্ত সাথীদের ডেকে বললেন, তোমরাও এসে যাও মহান আল্লাহ পাক তিনি আমাদের জন্য পানি সৃষ্টি করেছেন। কুরাইশরাও আসলেন নিজেরাও পান করলেন জন্তুদেরকেও পান করালেন। অতঃপর কাফিলার সকলেই বলতে লাগলেন, হে হযরত আব্দুল মুত্তালিব আলাইহিস সালাম! মহান আল্লাহ পাক তিনি আপনার পক্ষে ফায়ছালা দিয়েছেন। যে আল্লাহ পাক তিনি এই পানিবিহীন ময়দানে আমাদেরকে পানি পান করিয়েছেন, তিনিই আপনাকে যমযমও হাদিয়া করেছেন। কাজেই আমরা সকলেই ফিরে যাই। যমযম একমাত্র আপনার। আমরা এতে অংশীদার নই।
অতঃপর হযরত আব্দুল মুত্তালিব আলাইহিস সালাম তিনি যমযম কূপের নিকটে কিছু হাউস নির্মাণ করলেন, যাতে হাজীদের পান করানোর জন্য পানি ভরে রাখা হতো। কিছু দুষ্কৃতকারী অপকীর্তি শুরু করলো। তারা রাতে এসে হাউসগুলোতে ময়লা ফেলে যেতো, যখন প্রভাত হতো হযরত আব্দুল মুত্তালিব আলাইহিস সালাম তিনি সেগুলো পরিষ্কার করতেন। অবশেষে হযরত আব্দুল মুত্তালিব আলাইহিস সালাম তিনি মহান আল্লাহ পাক উনার নিকট দোয়া করলেন, যমযম কূপ-এর পানি ও হাউস নোংরাকারীদের বিরুদ্ধে, তখন স্বপ্নযোগে উনাকে বলা হলো যে, আপনি দোয়া করুন,
اللهم انى لا احلها المغتسل ولكن هى لشارب حل.
অর্থ: “হে মহান আল্লাহ পাক আমি এ যমযমের পানিতে লোকদের গোসল করার অনুমতি দেইনি, শুধু পান করার অনুমতি দিয়েছি।”
সকালে উঠেই হযরত আব্দুল মুত্তালিব আলাইহিস সালাম তিনি এটা ঘোষণা করে দেন। অতঃপর যে এই হাউস নষ্ট করার ইচ্ছা করতো, সেই কঠিন অসুখে পতিত হতো। যখন বারবার এ ঘটনা ঘটতে থাকলো তখন দুষ্কৃতকারীরা হযরত আব্দুল মুত্তালিব আলাইহিস সালাম উনার হাউজের বিরোধিতা করা ছেড়ে দিলো।

EmoticonEmoticon