উদ্ভিদের নাম : পেঁপে গাছ
প্রচলিত নাম :পেঁপে। ইউনানী নাম:পাপিতা, আরানড খরবূযা। আয়ুর্বেদিক নাম:অমৃততুম্বী।
বর্গ: Brassicales
পরিবার: Caricaceae
গণ: Carica
প্রজাতি: C. papaya
বৈজ্ঞানিক নাম : Carica papaya Linn
ব্যবহার্য অংশ: তরুক্ষীর(আঠা), ফল ও পাতা
রোপনের সময় : নার্সারীতে চারা জন্মানোর পর ৭-১০ সেমি উঁচু হলে তা লাগানোর উপযুক্ত হয়। এটি প্রায় সারা বছরই জন্মে।
উত্তোলনের সময় : এটিকে বারোমাসি উদ্ভিদ ও বলা যায়। সারা বছরই পাওয়া যায়।
আবাদী/অনাবাদী/বনজ: এটি বসতবাড়ী এবং বাগানে চাষ করা হয়।
চাষের ধরণ: পেঁপে সব ধরনের মাটিতে জন্মে থাকে । বেলে মাটিতে বেশি ভালো জন্মে।এটি উঁচু স্যাঁতস্যাঁতে জায়গায় ভালো জন্মে। এটি চাষের জন্য প্রথমে বীজ তলায় বীজ রোপন করতে হয়। পরবর্তীতে চারা গজালে বীজ তলা থেকে তুলে অন্যত্র লাগানো হয়। এটি রোপনের ক্ষেত্রে তেমন দূরত্বের প্রয়োজন হয়না ।
উদ্ভিদের ধরণ: পেঁপে বহু বর্ষজীবি নয়। এটি সবুজ কান্ড বিশিষ্ট মধ্যমাকারের সোজা গাছ।
পরিচিতি: এ গাছ মধ্যমাকারের সোজা গাছ। প্রায় ২০-২৫ ফুট উঁচু হয়। শাখা-প্রশাখা হয় না। তবে গাছ পুরানো হলে দু একটি শাখা বের হয়। মূল কান্ডের চারপাশে পাতা বের হয় এবং পাকলে ঝরে যায়। এটি আকারে বেশ বড় হয়। এর কিনারা ৭ ভাগে বিভক্ত। নলের মত বোঁটাটি ফাঁপা, এটি ৩ সে.মি. পর্যন্ত লম্বা হয়। পাতার গোড়া ও কান্ডের যোগস্থলে ফুল বের হয়। সব ফুল থেকে আবার ফল হয়না। স্ত্রী জাতীয় ফুল থেকে ফল হয়। এর আকার বেশ বড়। তবে এর গা ঢেউ খেলানো হয়। কাঁচা অবস্থায় এর রং সবুজ পাকলে কিছুটা অংশ হলুদ হয়। এতে দুধের মত আঠা আছে। এই ফলের মধ্যে ফাঁপা এবং অনেকগুলি বিচি থাকে। ফল কচি থাকা অবস্থায় বিচির রং সাদা এবং পাকলে ধুসর বা কালো হয়ে থাকে। প্রায় সারা বছরই ফুল ও ফল দেখা যায়।
১০০ গ্রাম পাকা পেঁপের পুষ্টিগুণ:
উপাদান
|
পরিমাণ
|
| প্রোটিন | ০.৬ গ্রাম |
| ফ্যাট | ০.১ গ্রাম |
| মিনারেল | ০.৫ গ্রাম |
| ফাইবার | ০.৮ গ্রাম |
| কার্বোহাইড্রেড | ৭.২ গ্রাম |
| খাদ্যশক্তি | ৩২ কিলোক্যালরি |
| ভিটামিন সি | ৫৭ মিলিগ্রাম |
| সোডিয়াম | ৬.০ মিলিগ্রাম |
| পটাসিয়াম | ৬৯ মিলিগ্রাম |
| আয়রন | ০.৫ মিলিগ্রাম |
রাসায়নিক উপাদান: পাতা ও অপক্ক ফল তরুক্ষীর সমৃদ্ধ। এই তরুক্ষীর প্রচুর পরিমাণের হজমকারী এনজাইম পেপেন বিদ্যমান। পাতায় অ্যালকালয়েড, গ্লুকোসাইড এবং ফলে প্রচুর পরিমাণ ভিটামিন আছে।
ঔষধি গুনাগুন : কাঁচা পেঁপের রস থেকে পেপসিন নামক জারক রস পাওয়া যায়। যা অজীর্ণরোগে বিশেষ ফলদায়াক। পেঁপের আঠা মুত্রনালীর ক্ষতে ব্যবহারে উপকার পাওয়া যায়। ডিপথেরিয়া, স্পলীহা ও যকৃত বৃদ্ধিতে পেঁপের রসের ব্যবহারে উপকার পাওয়া যায়। পেঁপের আঠা বাহ্যিক প্রয়োগও হয়। শুষ্ক দাদ ও একজিমাতে এর আঠা ব্যবহার করলে উপকার পাওয়া যায়। এছাড়া সবজি হিসাবে রান্না করে খেলে অর্শরোগে হিতকর এবং এটি স্তন বৃদ্ধি কারক হিসাবে প্রসিদ্ধ আছে। পেঁপের বীজ ক্রিমিনাশক রজঃনিসারক ও তৃষ্ণা নিবারক হিসাবে ব্যবহ্রত হয়। কাঁচা পেঁপের আঠা ও বীজ ক্রিমিনাশক রজঃনিসারক ও প্লীহা-যকৃতের হিতকর। পাকা পেঁপে কোষ্ঠ পরিষ্কারক, বায়ুনাশক ও মূত্রকারক।
১। রক্ত আমাশয়: প্রত্যহ সকালে কাঁচা পেঁপের আঠা ৫/৭ ফোঁটা ৫/৬ টি বাতাসার সঙ্গে মিশিয়ে খেতে হবে। ২/৩ দিন খাওয়ার পর রক্তপড়া কমতে থাকবে।
২। ক্রিমি: যে কোন প্রকারের ক্রিমি হলে, পেঁপের আঠা ১৫ ফোঁটা ও মধু ১চা চামচ একসঙ্গে মিশিয়ে খেতে হবে। এরপর আধা ঘন্টা পরে উঞ্চ পানি আধ কাপ খেয়ে তারপরে ১ চামচ কলিচুনের পানি খেতে হয়। এভাবে ২ দিন খেলে ক্রিমির উপদ্রব কমে যাবে।
৩। আমাশয়: আমাশয় ও পেটে যন্ত্রনা থাকলে কাঁচা পেঁপের আঠা ৩০ ফোঁটা ও ১ চামচ চুনের পানি মিশিয়ে তাতে একটু দুধ দিয়ে খেতে হবে। একবার খেলেই পেটের যন্ত্রনা কমে যাবে এবং আমাশয় কমে যাবে।
৪। যকৃত বৃদ্ধিতে: এই অবস্থা হলে ৩০ ফোঁটা পেঁপের আঠাতে এক চামচ চিনি মিশিয়ে এক কাপ পানিতে ভালো করে নেড়ে মিশ্রণটি সারাদিনে ৩বার খেতে হবে। ৪/৫ দিনের পর থেকে যকৃতের বৃদ্ধিটা কমতে থাকবে, তবে ৫/৬ দিন খাওয়ার পর সপ্তাহে ২ দিন খাওয়াই ভালো। এভাবে ১ মাস খেলে ভাল ফল পাওয়া যাবে।
৫। ক্ষুধা ও হজম শক্তিতে: প্রত্যেকদিন সকালে ২/৩ ফোঁটা পেঁপের আঠা পানিতে মিশিয়ে খেতে হবে। এর দ্বারা ক্ষুধাও বেড়ে যাবে এবং হজমও ঠিকভাবে হবে।
৬। পেট ফাঁপায়: কয়েক টুকরো পাকা পেঁপের শাঁষ, আর সামান্য লবন এবং একটু গোলমরিচের গুড়ো একসংগে মিশিয়ে খেতে হবে। এর দ্বারা পেট ফাঁপার উপশম হয়।
৭। প্রবল জ্বরে: দেড় চামচ পেঁপে পাতার রস এক কাপ পানিতে মিশিয়ে খেতে হবে। এর দ্বারা জ্বরের বেগ, বমি, মাথার যন্ত্রনা, শরীরে দাহ কমে যাবে। জ্বর কমে গেলে আর খাওয়ার প্রয়োজন নেই।
৮। মাসিক মাজুরতা(ঋতু বন্ধে): যাদের মাসিক ঋতু বন্ধ হওয়ার সময় হয়নি অথচ বন্ধ হয়ে গিয়েছে অথবা যেটুকু হয় তা না হওয়ারই মত, সেক্ষেত্রে ৫/৬ টি পাকা পেঁপের বিচি গুড়া করে রোজ সকালে ও বিকালে দু’বার পানিসহ খেতে হবে। এর ফলে কয়েকদিনের মধ্যেই মাসিক স্রাব ঠিক হয়ে যাবে, তবে অন্য কোন কারনে এটা বন্ধ হয়ে গেলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
৯। দাদে: সে যে কোনো প্রকারের হোক না কেন, কাঁচা পেঁপের/গাছের আঠা ঐ দাদে লাগিয়ে দিতে হবে, একদিন লাগিয়ে পরের দিন লাগাতে হবে না, এরপরের দিন আবার লাগাতে হবে, এইভাবে ৩/৪ দিন লাগালে দাদ মিলিয়ে যাবে।
১০। একজিমায়: যে একজিমা শুকনা অথবা রস গড়ায় না, সেখানে ১ দিন অথবা ২ দিন অন্তর পেঁপের আঠা লাগালে ওটার চামড়া উঠতে উঠতে পাতলা হয়ে যায়।
১১। উকুন হলে: ১ চামচ পেঁপের আঠা, তার সঙ্গে ৭/৮ চামচ পানি মিশিয়ে ফেটিয়ে নিতে হয়। তারপর ওই পানি চুলের গোড়ায় লাগিয়ে কিছুক্ষণ রাখার পর মাথা ধুয়ে ফেলতে হয়। এইভাবে একদিন অন্তর আর একদিন বা ২ দিন লাগালে উকুন মরে যায়।
১২। কোলেস্টেরল কমায়: অন্যান্য ফলের মতই পেঁপেতে কোনো কোলেস্টেরল নেই। আর পেঁপেতে আছে প্রচুর পরিমাণে ফাইবার। তাই কোলেস্টেরলের সমস্যায় যারা দুশ্চিন্তায় আছেন তাঁরা প্রতিদিনের খাবার তালিকায় পেঁপে রাখুন। অন্যান্য কোলেস্টেরল যুক্ত খাবারের বদলে পেঁপে খান। তাহলে আপনার কোলেস্টেরলের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে থাকবে।
পেঁপেতে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, বিটা ক্যারোটিন, ফ্লেভানয়েড, লুটেইন, ক্রিপ্টোক্সান্থিন আছে। এছাড়াও আরো অনেক পুষ্টি উপাদান আছে যেগুলো শরীরের জন্য খুবই উপকারী। ক্যারোটিন ফুসফুস ও অন্যান্য ক্যান্সারের ঝুঁকি কমায়। অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট শরীরকে বয়সের ক্ষতির থেকে রক্ষা করে।
ত্বকের হারানো সৌন্দর্য ফিরে পেতে: আমাদের ত্বক কোমল এবং উজ্জ্বল করতে পেঁপের জুড়ি নেই। এখানে একটি মাস্ক তৈরির পদ্ধতি বলা হল: আধা কাপ পাকা পেঁপে, ৪ টেবিল চামচ নারকেলের দুধ(ডাবের নরম অংশ), ১/৪ কাপ কর্নফ্লেক্স একটি পাত্রে নিয়ে চটকে নিয়ে মুখ, হাত এবং গলায় ৫ মিনিট স্ক্র্যাব করুন। পানি দিয়ে ধুয়ে মশ্চারাইজার লাগিযে নিন।
আধা কাপ পাকা পেঁপে, ৪ টেবিল চামচ কমলার রস, ৪ টেবিল চামচ গজরের রস, ১ চা চামচ মধু একসঙ্গে মিলিয়ে ত্বকে মেখে কিছুক্ষণ রেখে ধুয়ে নিন।
নিয়মিত যত্নে আপনার ত্বক কোমল ও মশৃণ হবে। সব ধরনের ত্বকেই পেঁপের তৈরি মাস্ক ব্যবহার করতে পারেন।
রন্ধন সেসিপি:
পেপে গাজর মিক্সড খির:
উপাদান:
>> দুধ ১ কেজি
>> গুড়া দুধ ২ টেবিল চামচ
>> গাজর দেড় কাপ
>> পেঁপে ১ কাপ
>> পোলাউএর চালের গুড়া ২ টেবিল চামচ
>> চিনি ২৫০ গ্রাম
>>দারুচিনি ২ টুকরা
>> এলাচ ২ টি
>> কিসমিস ও পেস্তা বাদাম পরিমাণ মতো
প্রথমে গাজর ও পেঁপে গ্রেড করে বা কুচি করে কেটে পানি দিয়ে সেদ্ধ করে ছেকে নিন। তার পর তরল দুধ ও গুড়া দুধ ভালো করে মিশিয়ে জ্বাল দিন এর পর চিনি সব মসলা একসাথে দুধে ঢেলে ভালোভাবে জ্বাল দিয়ে দুধ ঘন হওয়া পর্যন্ত নারত থাকুন। এবার গাজর ও পেঁপে দিয়ে আবার কিছু ক্ষন জ্বাল দিন। সব শেষে চালের গুড়া পানিতে গুলিয়ে দুধে ঢেলে দিন। ঘন হয়ে জমাট বাধলে নামিয়ে কিসমিস ও সেস্তাবাদাম কুচি ছড়িয়ে পরিবেশন করুন আপনা খির।
পেঁপের শরবতের রেসিপি।
উপকরণ :
পাকা পেঁপে ১টি মাঝারি সাইজের, পাকা খেঁজুর ২-৫টি, চিনি পরিমাণমত, দুধ পরিমাণ মত, পানি পরিমাণমতো।
প্রস্তুত প্রণালী :
প্রথমে একটি বাটিতে দুধ ও চিনি ৫ মিনিট একসাথে ভিজিয়ে রাখুন। তারপর অন্য একটি বাটিতে পাকা পেঁপে ছিলে ছোট ছোট টুকরো করে নিন। এরপর পাকা খেঁজুর কেটে ছোট ছোট টুকরো করে নিন একইভাবে। এরপর ভিজানো দুধচিনি এবং কাটা পেঁপে ও খেঁজুরের সঙ্গে অল্প পরিমাণ পানি ৫ মিনিটের মত সময় ধরে ব্লেন্ড করুন। ব্লেন্ডার থেকে নামিয়ে বরফ কুচি দিয়ে পরিবেশন করুন পেঁপের শরবত।


EmoticonEmoticon