হরীতকী এর গুন!



হরীতকী পাতা, ফুল ও ফল
শুকনো হরীতকী ফল
হরীতকী:
ইংরেজী নাম: Chebulic Myrobalan, Black Myrobalan
বৈজ্ঞানিক নাম: Terminalia chedula.
পরিবার: Combretaceae
সদয়:   Terminalia
প্রজাতি:  T. chebula
পরিচিতি : বৃক্ষ জাতীয় উদ্ভিদ। এটা ২১ থেকে ২৪ মিটার পর্যন্ত হতে পারে। পাতাগুলো অনেকটা জামরুলের পাতার মতো। তবে এর মতো চকচকে নয়। শীতকালে পাতা ঝরে এবং অতি অল্প দিনের মধ্যেই নতুন পাতা হয়। কাঠ শক্ত ধূসর বর্ণ এবং সবুজাভ। পত্র ৭.৬২ সেন্টিমিটার হতে ২০.৩২ সেন্টিমিটার লম্বা বোঁটাযুক্ত, পাতার অগ্রভাগ সরু নয়। ফুল উভলিঙ্গ, শ্বেতবর্ণ, উগ্র গন্ধবিশিষ্ট ফল লম্বাকৃতির, দুমুখ সুঁচালো, ফলে একটিমাত্র বীজ থাকে। ফলে পাকা ধরলে হলুদাভ সবুজ বর্ণ ধারণ করে এবং চিবুলে তিতকুটে লাগে। ফলের কোনো কিছু ফেলনা নয়। বীজের ভেতরের শাঁসও মজা করে খাওয়া যায়। হরীতকী ভেষজ গুণসমৃদ্ধ। আয়ুর্বেদিক ওষুধ তৈরিতে ত্রিফলা ব্যবহৃত হয়।
বিস্তার ও চাষাবাদ : চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম, ঢাকা ও ময়মনসিংহ বনাঞ্চলে স্বাভাবিকভাবে জন্মে। গ্রামাঞ্চলে লাগানো হয়। পরিকল্পিত কোনো বাগান নেই অথচ ত্রিফলার একটি উপাদান হিসেবে প্রচুর চাহিদা আছে। চাহিদা পূরণের জন্য বাণিজ্যিক চাষাবাদ প্রয়োজন। বীজ থেকে বংশবিস্তার সম্ভব। অগ্রহায়ণ-চৈত্র মাস পর্যন্ত ফল সংগ্রহ করা যায়। ফলে সংগ্রহের পর ৭-১০ দিন রোদে শুকিয়ে বীজ হিসেবে ৩০-৪০ দিন স্বাভাবিকভাবে সংরক্ষণ করা যায়। শুকনো কোঁকড়া ফলের ভেতরে বীজ থাকে। সংগ্রহের ৩০-৪৫ দিনের মধ্যে মাটি ও গোবর (৩:১) মিশ্রিত বীজতলায় লাগানো হয়। বীজ লাগানোর আগে বীজের জলীয় বাষ্পের পরিমাণ ১৫-২০ শতাংশ থাকা ভালো। ফলের চামড়া ফেলে দিয়ে শুধু বীজকে ৪৮ ঘণ্টা পানিতে ভিজিয়ে লাগালে ৫০% বীজ অঙ্কুরিত হয়। আস্তফল ৪৮ ঘণ্টা পানিতে ভেজানোর পর ১০% সালফিউরিক এসিডে ২০ মিনিট রেখে ভালো করে পানিতে ধুয়ে ফলের আবরণ ফেলে লাগালে ৬৮% বীজ অঙ্কুরিত হয়। বীজ লাগানোর ২৫-৩০ দিনের মধ্যে বীজ অঙ্কুরিত হওয়া শুরু হয় এবং অঙ্কুরোদগম ২-৩ মাস পর্যন্ত চলে। চারা গজানোর ৩০-৪৫ দিনের মধ্যে মাটি ও গোবর (৩:১) ভর্তি পলিথিন ব্যাগে চারা লাগানো হয়। ব্যাগে লাগানো চারায় নিয়মিত পানি দেয়া প্রয়োজন। চার-পাঁচ মাস বয়সে চারা মাঠে লাগানো যায়। ভেজা স্যাঁতসেঁতে মাটি এটা চাষের উপযোগী। পাহাড়ের ঢালুতেও হরীতকী চাষ করা হরীতকী মধ্যম থেকে বৃহদাকার চিরসবুজ বৃক্ষ।
ব্যবহার্য অংশ : মূল, ফল ও বীজ।
হরীতকী বললেই ত্রিফলার কথা আসে। ত্রিফলা মানে তিনটি ফলের সমাহার। এই তিনটি ফল হলো_ আমলকী, হরীতকী ও বহেড়া। তবে তিনটি ফলের মধ্যে হরীতকীর রয়েছে অসাধারণ গুণ। এক ওষুধ গবেষক দলের মতে, আধুনিক যে কোনো অ্যালোপ্যাথিক ওষুধের তুলনায় ত্রিফলা কোলেস্টেরল কমানোর ক্ষেত্রে অনেক বেশি ফলপ্রসহৃ। তাদের মতে, দ্রব্যগুলোর দিক দিয়ে হরীতকীই সর্বশ্রেষ্ঠ।
ভেষজ ব্যবহার : হরীতকী চূর্ণ ঘোলের সঙ্গে একটু সৈন্ধব লবণ মিশিয়ে অশ্বরোগ নিরাময় হয় এবং অল্প গাওয়া ঘিয়ের সঙ্গে খেলে পিত্তশূলে উপকার হয়। হরীতকী চূর্ণ পাইপে ভরে ধূপপান করলে হাঁপানি উপশম হয়(বিষয়টি তাহহিক করার প্রয়োজন রয়েছে)। রক্ত দূষিত বা পিত্তরোগজনিত চর্মরোগ নিশিন্দা পাতার রসের সঙ্গে হরীতকী চূর্ণ খেলে উপকার হয় এবং গুলঞ্চের রসের সঙ্গে চূর্ণ মিশিয়ে খেলে শোথরোগে উপকার পাওয়া যায়। যে কোনো ক্ষতে হরীতকী পোড়া ছাই মাখন মিশিয়ে লাগালে ঘা সেরে যায়। চিনি ও পানির সঙ্গে হরীতকী চূর্ণ করে ব্যবহার করলে চোখ ওঠা ভালো হয়। হরীতকী বলকারক জীবনশক্তি বৃদ্ধিকারক ও বার্ধক্য নিবারক।
ঔষধী গুনাগুন:
আয়ুর্বেদিক বিজ্ঞানে ত্রিফলা নামে পরিচিত তিনটি ফলের অন্যতম ফল হরীতকী। এর নানা গুণ আছে। স্বাদ তিতা। এটি ট্যানিন, অ্যামাইনো এসিড, ফ্রুকটোজ ও বিটা সাইটোস্টেরল-সমৃদ্ধ। এ গাছকে মায়ের সঙ্গে তুলনা করে থাকেন ভেষজ চিকিত্সকরা।
রক্তচাপ কমায়: হরীতকী গুঁড়োর সরবত রক্তচাপ কমিয়ে দেয়। আয়ুর্বেদিক চিকিত্সকরা এ সরবতকে অ্যালোপেথিক চিকিত্সা পদ্ধতির যেকোনো ওষুধের চেয়ে বেশি কার্যকর মনে করেন। পাশাপাশি অন্ত্রের অনিয়ম কিংবা খিঁচুনিও দূর করে এ ভেষজ।
কলেরা ও আমাশয় নিরাময়ে: কলেরা-আমাশয় নিরাময়ে খেতে পারেন হরীতকী। বিশেষ করে ক্রনিক ডায়রিয়া নিরাময়ে হরীতকী উত্তম দাওয়াই। হরীতকীর গুঁড়ো ও মধু এক চা চামচ করে একটি বাটিতে মেশান। কলেরা-ডায়রিয়া থেকে লাঘব পেতে দিনে দুবার এ মিশ্রণ খান।
পেট পরিষ্কার করতে: পেট পরিষ্কার হচ্ছে না? এবার তাহলে হরীতকী গুঁড়ো করে নিন। রাতে ঘুমানোর আগে লবঙ্গ অথবা দারচিনি এবং হরীতকীর গুঁড়ো ও বিট লবণ মিশিয়ে খেতে পারেন। এতে পেট পরিষ্কার হয়ে যাবে।
রূপচর্চায়: হরীতকীর গুঁড়ো নারকেল তেলের সঙ্গে ফুটিয়ে মাথায় লাগাতে পারেন। চুল ভালো রাখে এ পদ্ধতি। একই সঙ্গে হরীতকী গুঁড়ো মেশানো পানি নিয়মিত খেলে ত্বকের উজ্জ্বলতা বেড়ে যায়।
গলা ব্যথায়: মুখ ফোলা কিংবা গলা ব্যথার যন্ত্রণায় আছেন? এ সমস্যা থেকে পরিত্রাণ পেতে গরম পানিতে হরীতকী ফুটিয়ে নিন। এবার ফোটানো পানি দিয়ে গারগল করতে থাকুন। আরাম পাবেন। এ পানি খেতেও পারেন। এতে অ্যালার্জির উপশম হবে। এছাড়া দাঁতের ব্যথা তাড়াতে হরীতকী গুঁড়ো লাগাতে পারেন।
হজমে: হজমশক্তি বাড়াতে হরীতকী খেতে পারেন। রাতে শোবার আগে নিয়মিত হরীতকীর গুঁড়ো খেতে থাকুন। এ অভ্যাস পুষ্টির গুণাগুণ সঠিক রাখে। ফলে হজমশক্তি বেড়ে যায়।
এসিডিটি থেকে মুক্তি পেতে: আয়ুর্বেদিক চিকিত্সায় হরীতকীই সেরা অ্যান্টাসিড হিসেবে বিবেচিত। হরীতকী ও আমলকীর গুঁড়ো মিশিয়ে সরবত করে খান কিংবা চিবিয়ে খেতে পারেন হরীতকী। এসিডিটি থেকে মুক্তি পাবেন।
শ্বাসকষ্ট: শ্বাসকষ্ট থেকে পরিত্রাণ পেতে প্রতি রাতে হরীতকী চিবুতে পারেন। নিশ্চিত থাকুন, কষ্ট কমে যাবে।
অ্যালার্জি কমায়:অ্যালার্জি দূর করতে হরীতকী বিশেষ উপকারী। হরীতকী ফুটিয়ে সেই পানি খেলে অ্যালার্জি কমে যাবে।
বিবিধ ব্যবহার
হরীতকীর কাঠ দিয়ে তৈরি আসবাব টিকে থাকে দীর্ঘদিন। এর কাঠ ভীষণ শক্ত ও টেকসই। এ কাঠ দিয়ে কৃষি যন্ত্রপাতি ও আসবাব পত্র তৈরি হয়। এ গাছের ফল থেকে ট্যানিন, লেখার কালি ও রঙ পাওয়া যায়।
Previous
Next Post »